রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। তবে প্রতিষ্ঠানটির চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম, অপচয় ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: ভুয়া বিল, জ্বালানি-ফেরি খরচ, মাইলেজ ও টিএ/ডিএ’র নামে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ; দুদকে তদন্তের দাবি
রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। তবে প্রতিষ্ঠানটির চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম, অপচয় ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে বিভিন্ন খাতে প্রায় ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি অপচয়, ক্ষতি ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। তবে অভিযোগে উত্থাপিত এসব অর্থের বিষয়ে চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
দুদকে দেওয়া অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট নথির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ডিপোর রাজস্ব আদায়, জ্বালানি, গ্যারেজ, টুলস, ফেরি ব্যয়, মাইলেজ ভাতা, দৈনিক ভাতা, টিএ/ডিএ এবং বিবিধ খাতে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন ও হিসাবের অসঙ্গতির ঘটনা ঘটেছে।অভিযোগকারী বিআরটিসির কেন্দ্রীয় স্টোর অফিসার মো. মোস্তাকিজুর রহমান দাবি করেছেন, বিভিন্ন খাতে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে নগদ অর্থ উত্তোলন করে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার অপচয়, ক্ষতি ও চুরি হয়েছে। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সময়ের ৪৩০ পাতারও বেশি নথি ও তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
অভিযোগে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর সাবেক ইউনিট প্রধান (ম্যানেজার অপারেশন) মো. মফিজ উদ্দিনের নাম রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি জুলাই ২০২২ থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি প্রধান কার্যালয়ে অপারেশন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।অন্যদিকে মো. কামরুজ্জামান সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত ওই ডিপোতে সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি খুলনা বাস ডিপোর দায়িত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।এ ছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাশিয়ার মো. আ. করিম এবং হিসাব কর্মকর্তা মো. রমজান হোসেনের নামও অভিযোগে এসেছে। অভিযোগকারী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং দুদকের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
জ্বালানি ও ভাতা খাতে অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেল, ফেরি বিল, গ্যারেজ শ্রমিকের মজুরি, মাইলেজ বিল, দৈনিক ভাতা এবং টিএ/ডিএসহ বিভিন্ন খাতে নগদ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এসব অর্থের একটি অংশ যথাযথভাবে ব্যয় বা হিসাবভুক্ত না করার অভিযোগও রয়েছে।একই সময়ে ডিপোর রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট হিসাব, বিল-ভাউচার, ব্যাংক ও ক্যাশবুকসহ অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
বিআরটিসির অভ্যন্তরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মো. মফিজ উদ্দিন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় ব্যবহার করতেন এবং এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও বরিশালসহ গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে দায়িত্ব পেয়েছেন।একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধেও। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনিও রাজনৈতিক প্রভাবশালী একটি পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন পেয়েছেন।তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা আত্মীয়তার দাবির স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়গুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিআরটিসিতে সিন্ডিকেটের অভিযোগ
বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটিতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার কথা উল্লেখ করে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।তার বক্তব্যের সূত্র ধরে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে পুরোনো প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক ও পদায়ন ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত বলে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার জন্য তদন্তের ফলাফল প্রয়োজন।
টিআইবির উদ্বেগ
পরিবহন খাতের দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন গবেষণায় পরিবহন খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও জবাবদিহিতার ঘাটতির বিষয় উঠে এসেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদায়নে স্বচ্ছতা, আর্থিক লেনদেনে জবাবদিহিতা এবং নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করা না হলে অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে নগদ অর্থ উত্তোলন, জ্বালানি ব্যয়, ভাতা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে মো. মফিজ উদ্দিন ও মো. কামরুজ্জামানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলো সত্য বা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা বিষয়গুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
দ্রুত তদন্তের দাবি
চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিল-ভাউচার, ক্যাশবুক, রাজস্ব রেজিস্টার, জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব, ফেরি ব্যয়, মাইলেজ ও টিএ/ডিএসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি নিরীক্ষা করা হলে প্রকৃত আর্থিক চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।অভিযোগের বিষয়ে দুদক ও বিআরটিসির পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এবং দায়ীদের ভূমিকা স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে ঘিরে প্রায় ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকার অনিয়মের যে অভিযোগ উঠেছে, তার চূড়ান্ত সত্যতা এখন নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ওপর।